শেরপুরে বাক ও শ্রবণ বধির জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

শেরপুরে বাক ও শ্রবণ বধির জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে এক মতবিনিময় সভা হয়েছে। নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ শেরপুর জেলা কমিটির আয়োজনে শনিবার (৯ মে) দুপুরে শহরের নিউমার্কেট আইডিইবি কার্যালয়ে (ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ) এ মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় শেরপুর জেলার বাক ও শ্রবণ বধির জনগোষ্ঠির সমস্যা, সম্ভাবনা এবং তাদের কল্যাণে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই বিশেষ জনগোষ্ঠির প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি ও তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার উপর জোর দেওয়া হয়।
জনউদ্যোগ আহবায়ক শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে আলোচনায় সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. হামিদুর রহমান, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রধান সহকারী কবি হাসান শরাফত, শেরপুর প্রেসক্লাবের কার্যকরি সভাপতি রফিক মজিদ, উদীচী জেলা সংসদের সাবেক সভাপতি তপন সারোয়ার, জেলা বাক ও শ্রবণ বধির উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি মো. হারুন মিয়া।
অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন, সিপিবি নেতা সোলায়মান আহমেদ, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা আরডিএস কর্মকর্তা রতন সাহা, ব্র্যাক শাখা ব্যবস্থাপক রুমা রানী দেব, জেলা মহিলা পরিষদ সাংগঠনিক সম্পাদিকা আইরীন পারভীন, আদিবাসী নেতা সুমন্ত বর্মন, সাংবাদিক হাকিম বাবুল প্রমুখ।
সভায় বক্তারা বলেন, বাক ও শ্রবণ বধির জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের গৃহিত বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে স্থানীয় বাক ও শ্রবন প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং এর সুফল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারীভাবেও তাদের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তৈরী করতে হবে। সর্বোপরি চিকিৎসা সেবা, শিক্ষা কার্যক্রম, অনুদান প্রদান, কর্মসংস্থান সহায়ক উপকরণ বিতরণ, প্রশিক্ষণ, আবাসন সুবিধা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাক ও শ্রবন প্রতিবন্ধীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদেরকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করে আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
মতবিনিময় সভায় জনউদ্যোগের পক্ষ থেকে জেলার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের একটি ডাটাবেজ তৈরীসহ তাদের উন্নয়নে ১০ দফা প্রস্তাবনা সম্বলিত একটি লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য কারিগরি এবং সাধারণ শিক্ষা প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কম্পিউটার-হস্তশিল্প, দর্জি বিজ্ঞান, মৎস্য চাষ, পশুপালন সহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা অনুযায়ী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা ও যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বাংলা ইশারা ভাষার প্রচলন ও প্রসার। চাহিদা অনুযায়ী শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র (হেয়ারিং এইড) প্রদানের ব্যবস্থা করা। সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও কোটা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এতে সাংবাদিক হাকিম বাবুল বলেন, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর গুণাবলি লালন ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনার জাগরণ ঘটাতে হবে। এই আলোচনা সমাজের প্রতি আমাদের বার্তা পৌঁছে দেবে। আমরা সর্বস্তরের মানুষকে অনুরোধ জানাই, যেন তারা এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। তাদের প্রতি সকল প্রকার সহযোগিতা প্রসারিত করেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়া সম্ভব হবে।
শেরপুর সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. হামিদুর রহমান বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সংরক্ষণ ও সমান সুযোগ-সুবিধার নিশ্চিতের কথা আইনে ব্যক্ত রয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির ন্যায় সমান অধিকার ভোগ করবে। সরকারীভাবে তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশাকরি শেরপুর জেলার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা সরকারী যেসব সুযোগ রয়েছে, তারা অবশ্যই তার আওতায় আসবে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রধান সহকারী কবি হাসান শরাফত বলেন, প্রতিবন্ধীদের নানা ক্ষেত্রে দক্ষতা রয়েছে। সরকারীভাবে প্রতিবন্ধীদেরকে সুবর্ণ নাগরিক হিসেবে ঘোষনা করা হয়েছে। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতাসহ দক্ষতা অনুসারে কর্মসংস্থান ও ঋণের সুযোগ রয়েছে। শেরপুরের বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীরাও এসব সরকারী সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কেউ যদি ভাতা থেকে বাদ পড়ে থাকে তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হবে।
সভার সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা বাক ও প্রবণ প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নের এই মানবিক উদ্যোগ নিয়েছি। বাক ও প্রবণ প্রতিবন্ধীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য তাদের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসতেই আমরা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের একত্রিত করে মতবিনিময়ের অবতারণা করেছি। আশাকরি এর মধ্য দিয়ে জেলার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর জীবনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে।




